হোসনা

মাহবুবুর রহমান
গল্প
হোসনা

হোসনার সাথে প্রথম পরিচয় কবে হয়েছিল তা মনে থাকার কথা নয়। কারণ জন্মের পর থেকেই আমরা পাশাপাশি বেড়ে উঠেছি। কবে হামাগুড়ি দিয়ে উঠোন পার হয়ে সদর রাস্তায় পৌঁছে সম্মুখের অবারিত উন্মুক্ত সোনার রঙের ধানক্ষেত দেখেছিলাম তাও মনে নেই। দেহের বৃদ্ধির সাথে সাথে মনের ভেতর উঁকি দেয়া হাজারো জিজ্ঞাসা পাখা মেলে ক্রমে তার ব্যপ্তি ছড়িয়ে পড়ছিল দিক থেকে দিগন্তে। চোখের সামনে ছোট্ট একটি গন্ডি আস্তে আস্তে প্রসারিত হতে হতে একটি বৃহত্তর জগত তৈরী হয়ে চলল। সেই প্রসরণমান জগতের একটি ছোট্ট গ্রহাণু হয়ে হোসনা আমার শৈশবের স্বপ্নময় ভুবনে চিরদিনের মত জড়িয়ে গেল।

আমাদের বিদ্যাশিক্ষার প্রথম ধাপটি শুরু হয় সেকান্দার মুহুরীর পাঠশালায়। আমাদের বাড়ীর উত্তর দিকে দুটি বাড়ীর পরেই মুহুরীর পাঠশালা। সেখানে হাতেখড়ির মধ্য দিয়ে আমাদের যাত্রা শুরু। একটি টিনের শ্লেটের উপর চক দিয়ে মৌলবী খবীর খলিফা আমার তর্জনী ও বৃদ্ধাঙ্গুলী আলগা করে চেপে ধরে বাংলা বর্ণমালার প্রথম বর্ণটি যখন দৃশ্যমান করলেন তখন এক অসীম বিস্ময়ে নিজের সৃষ্টির দিকে তাকিয়ে রইলাম। সেই থেকে বাংলা বর্ণমালার এক বর্ণনাতীত সম্মোহনীর জালে চিরদিনের মত জড়িয়ে গেলাম। নিয়ম মাফিক হাতেখড়ি শেষে সবাইকে লাঠি লজেন্স এবং খৈ মুড়ি বাতাসা দেয়া হল। আনন্দে উত্তেজনায় আমি আর হোসনা পাঠশালা থেকে বেরিয়ে এক দৌড়ে বাড়ীতে ফিরে মায়ের হাতে লাঠি লজেন্স দিয়ে দিলাম। যেন প্রথম চাকরীর প্রথম বেতন পেয়ে মায়ের কাছে দিগ্বিজয়ী বীরের প্রত্যাবর্তন। সেই লজেন্স পেয়ে মায়ের মুখে যে আলোকচ্ছ্বটার কোমল প্রস্ফুটন দেখেছিলাম তা আজও এত বছর পরে চোখের সামনে জ্বলজ্বল করছে।

কিন্তু বিদ্যার্জনের এই উত্তেজনার আগুন বেশিদিন স্থায়ী হল না। যা ছিল আনন্দের , নতুন আবিষ্কারের মোহনমায়া , তা অচিরেই নিয়মকানুন আর বাধ্যবাধকতার শৃংখল হয়ে খবীর খলিফার রুদ্র মূর্তি ধরে হাজির হল। নতুন পরিচয়ের পবিত্রতা ও বিস্ময় ঘুচে তা গতাণুগতিক আনন্দহীন কর্তব্যে পরিণত হল।

মৌলবী সাহেবের নির্দেশ মোতাবেক প্রতিদিন তালপাতায় বাংলা বর্ণমালার সবকটি বর্ণ কঞ্চির কলম আর কাঠকয়লার কালি দিয়ে লিখে বাতাসে শুকিয়ে তাঁকে দেখাতে হত। এই দীর্ঘ নিরস কাজটি করতে গিয়ে অনেক দুষ্টু ছেলের ঘন ঘন প্রকৃতির ডাকে সাড়া পড়ত। যখন প্রকৃতির ডাক বিশ্বাসযোগ্য সীমা অতিক্রম করত তখন তারা মুখের থুথু ফেলবার জরুরী কাজে বাইরে যেত। প্রকৃতির ডাক এবং থুথু ফেলবার পরেও যাদের বিদ্যার্জনকে নিছক অত্যাচার ছাড়া কিছু মনে হত না তারা ‘হুজুর পেটে ব্যথা করছে, বাইরে যাব’ এই মোক্ষম অস্ত্রটি প্রয়োগ করত। পেটে ব্যথা এমন একটি অদৃশ্য বস্তু যে একে বিশ্বাস করা ছাড়া অপ্রমাণ করা সহজ ব্যাপার নয়। হুজুর যদিও এই ফাঁকির কপটতা বুঝতেন কিন্তু নীরবে সহ্য করা ছাড়া গত্যন্তর ছিল না। নিয়মকানুনের এই কালাকানুনের জন্যই কবিগুরু বলেছিলেন, ‘আজ ইস্কুলে যাইবার জন্য যেমন কাঁদিতেছ, একদিন না যাইবার জন্যও তেমনি কাঁদিবে।’

একদিন পাঠশালায় তালপাতায় লিখছি। স্বরবর্ণ শেষ করে ব্যঞ্জন বর্ণ শুরু করেছি। পাশে বসা হোসনা প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে বাইরে যেতে উদ্যত হল।অমনি তার পায়ে লেগে আমার কালির দোয়াত কাৎ হয়ে পড়ে গেল। সমস্ত কালি মাটিতে ছড়িয়ে পড়ল। ভয়ে হোসনার হাত পা কাঁপা শুরু করল। হুজুর তর্জনি উঁচু করে গর্জন করে উঠলেন। এবং তৎক্ষণাৎ শাস্তি হিসেবে হোসনাকে দুই কান ধরে দাঁড় করিয়ে রাখলেন। কালি আমার, বিচার হুজুরের, আর কলঙ্ক হোসনার !
ক্লাসের সবগুলো ছাত্রছাত্রী হোসনার এই অপমান মেনে নিতে পারেনি।সবার মুখ সেই অপমানের কালিতে ছেয়ে গেল।

ক্লাসের শেষ পর্বটি ছিল উচ্চঃস্বরে নামতা পাঠ। এক থেকে দশ ঘর পর্যন্ত নামতা শেষ করতে ছুটির ঘন্টা বেজে উঠল। ছুটির সময়টা বরাবরই সবাই হুড়মুড় করে বের হতে চেষ্টা করে। সেই তাড়াহুড়ায় পাঠশালার দরজার চৌকাঠে পা হোঁচট খেয়ে উপুড় হয়ে পড়ে গেলাম। তীব্র বেদনায় মুখ উঁচু করে উঠতে গিয়ে যে হাতটি সবার আগে আমার দিকে প্রসারিত দেখলাম সেটি ছিল হােসনার হাত।

হোসনাদের বাড়ীতে একটি বিশাল বরই গাছ ।মাঘের শেষে টক মিষ্টির সুস্বাদু বরই ছিল আমাদের একটি প্রধান আকর্ষণ। বরই গাছের শক্ত কান্ড বেয়ে ধীরে ধীরে মগডালের চূড়ায় কন্টকবেস্টিত অম্লমধুর বরই বড়ই মধুর মনে হত। বরই গাছের ছোট ছোট শাখায় চড়ুই পাখীদের গুঞ্জরণ দুপুরের নিস্তব্ধতাকে ভেঙ্গে একটি সূক্ষ্ম সুরের আবহ তৈরী করত। সুরের সেই ধারাটি মগডালের ফাঁক দিয়ে উপরে বিস্তৃত নীলাকাশে বিলীন হয়ে যেত। মধ্যদুপুরে মগডালের সেইক্ষণে সম্পূর্ণ আত্মমগ্ন একটি শিশু এক অসীম কালের আহ্বান শুনতে পেত।

কিন্তু বরই গাছটি যতখানি আকর্ষণের , কালু মাতবর ছিলেন ততখানি বিকর্ষণের। কোনমতে যদি তিনি টের পেতেন যে তাঁর বরই গাছ দিনে দুপুরে আক্রান্ত , তাহলে টক মিষ্টির বরই মুহূর্তে পরিপূর্ণ টকে পরিণত হয়ে যেত। এ কারণে হোসনাই ছিল প্রধান মিত্রশক্তি। ঘরের গোপন খবর সে ই সরবরাহ করে দিত যাতে কালু মাতবরের যমকালো মূর্তি আমার বরই অভিযানকে নস্যাৎ করে দিতে না পারে।

বিকেলে খোলা মাঠে উদ্দেশ্যহীন ছুটাছুটি করা আমার আর হোসনার প্রিয় খেলা। কখনো ছাগশিশুর পেছন ধাওয়া করা, গরুর বাছুড়ের সঙ্গে দৌড়ের পাল্লা আবার কখনো হলুদ করবীর ফুলের মধু পান করা ছিল আমাদের দৈনন্দিন আনন্দ তালিকার অংশ। তবে সবচেয়ে শিহরণ জাগাল শালিখ পাখীর বাচ্চা ফুটানোর আশ্চর্য ঘটনা। খৈ গাছের শক্ত মগডালে শালিখ দম্পতির নতুন বাসা। পাঠশালা ছুটি হতেই হোসনা অত্যন্ত উত্তেজিত ভঙ্গিতে শালিখের খবর দিল। নতুন বাসায় দুটি ছোট্ট ডিম। সে আর কাউকে জানাতে চায় না। আমরা অতি সন্তর্পণে বিড়ালের মত সতর্ক ভঙ্গিতে হামাগুড়ি দিয়ে খৈ গাছের নিকটবর্তী হয়ে প্রতিদিন ডিম দেখে আসি। একদিন সত্যি সত্যি ডিম দুটি ফুটে দুটি ফুটফুটে বাচ্চা বেরিয়ে এল। শালিখ দম্পতির সে কি আনন্দ! জীবনের এই নতুন সৃষ্টি এক গভীর রহস্য হয়ে আমাদের চোখের সামনে উন্মোচিত হল।

মোটকথা শৈশবের স্বপ্নময় দূরন্ত সময়টি হোসনার সাথে ভাগাভাগি করে এগিয়ে চলছিল। আতঙ্ক ভয়কে জয় করে ক্রমাগত নতুন নতুন অজানা জগত আমাদের সামনে উন্মোচিত হতে থাকে। স্বরবর্ণ ব্যঞ্জনবর্ণ পার হয়ে শতকিয়া নামতার ছন্দময় কোরাসে নিজেদের নিস্প্রভ শৈশবকে স্বপ্নের ফানুস দিয়ে সুরবন্দী করেছিলাম।

পাঠশালার তালপাতা থেকে কালক্রমে আমরা কাগজের পাতার বইয়ে কল্পলোকের জগতে পা রাখলাম। বাঁশের কঞ্চির কলমের বদলে ঝর্ণা কলম বুকপকেটে শোভা পেল। বছরের শুরুতে নতুন বইয়ের গন্ধ ঈদের নতুন জামার গন্ধকে মনে করিয়ে দিত।নতুন বই যাতে কোনদিন পুরাতন না হয় সেজন্য প্রতিটি বই বাঁশ কাগজের মলাট দিয়ে জামা পরিয়ে দিতাম। বইচোরদের হাত থেকে রক্ষা পেতে মলাটের উপর গোটা গোটা নকসী অক্ষরে লিখে রাখতাম- ‘এই বইয়ের প্রকৃত মালিক …’ ইত্যাদি। এতকিছু সত্বেও আলীবাবাদের উৎপাতে বইয়ের প্রকৃত মালিক থেকে অপ্রকৃত মালিকের হাতে রদবদল হতে মলাটের নকসী ঘোষণা যথেষ্ট কার্যকর ছিল না।

তখন সবে গ্রীষ্মের দাবদাহ শুরু হয়েছে। চারিদিকে চৈত্রের রোদ বর্শার ফলার মত মাটিতে এসে বিদ্ধ হচ্ছে। মাটির রসটুকু শুষে নিয়ে বুভুক্ষু আকাশ তার তৃষ্ণা মেটাচ্ছে। গ্রামে পানীয় জলের তীব্র সংকট। আশেপাশে কোন চাপকল নেই।হোসনা আর আমি একমাইল দূরের মিঠাপুকুর থেকে মাটির কলসি করে খাবার পানি বয়ে নিয়ে আসি। গ্রামের বিভিন্ন পাড়ায় তখন কলেরা বসন্তের প্রকোপ দেখা দিয়েছে। এখনকার মত খাবার স্যালাইন বা কোন ধরণের আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা নেই। শিক্ষা স্বাস্থ্যজ্ঞান কিছুই নেই। গভীর এক অন্ধকার পুরো গ্রামকে গ্রাস করে আছে।

আজ সোমবার। স্কুলে সপ্তাহের প্রথম দিন। হোসনার আসতে দেরী দেখে ওদের বাড়ীতে গেলাম। সকাল থেকে ওর মায়ের শরীরটা ভাল যাচ্ছে না। ওর মা বললেন ,’আজ ও আমার কাছে থাকুক। আগামীকাল স্কুলে যাবে।’

বিষন্ন মনে পথে জালালকে সঙ্গে নিয়ে স্কুলে রওনা দিলাম। মাঠঘাট শুকিয়ে সব চৌচির।সূর্যের তপ্ত রশ্মি চাবুকের মত শরীরে বিদ্ধ হচ্ছে। হাতের ধূসর কালো রঙের শরীফ ছাতাটি দুজনে ভাগাভাগি করে কোনমতে মাথাটুকু ঢেকে মরুভূমির লু হাওয়া বাঁচিয়ে এগিয়ে চলছি। গাজী বাড়ি থেকে খোলা মাঠ পেরিয়ে কোনাকুনি তালুকদার বাড়ির পুকুরপাড়ে গিয়ে তালগাছের ছায়ায় কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলাম। গলা শুকিয়ে কাঠ। হাতের আজলায় পুকুরের পানি খেয়ে তৃষ্ণা মিটালাম। একবার ভাবলাম আজ স্কুলে যাব না। কিন্তু যে শিশুটি স্কুলে উপস্থিতির প্রতিযোগিতায় প্রথম পুরস্কারটির স্থায়ী প্রাপক তার মনে এটা সায় দিল না। তাই সব বাঁধা উপেক্ষা করে স্কুলে পৌঁছালাম।

সারাটা দিন এক নিঃসঙ্গতায় কেটে গেল। কেন যেন কোন কিছুতে মনোসংযোগ করতে পারছিলাম না। তীব্র দাবদাহ নিয়ে বিদ্যুৎবিহীন ক্লাসের মধ্যে কোন স্বস্তি মিলল না। গরমের কারণে আনসার স্যার আজ পিটি ক্লাস বাতিল করেছেন। স্কুলের কার্নিশে তৃষ্ণার্ত কাকেরা কা কা শব্দে ছটফট করছে। বাইরে মধ্যদুপুরে শস্যহীন খোলা মাঠ চৈত্রের গনগনে সাদা আগুনে প্রজ্জ্বলিত।

দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর বোস মশায়ের ছুটির ঘন্টা বেজে উঠল। ক্লাস শেষ করে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বাড়ীতে ফিরে এলাম। বাড়ীতে ফিরতেই মায়ের গম্ভীর মুখ দেখে ঘাবড়ে গেলাম।
‘গতরাত থেকে হোসনার মা দাস্তবমিতে ভুগছিল। সকাল থেকে হোসনাও অসুস্থ। পাঁচ ছয় ঘন্টার ডায়রিয়ায় ছেলেটা মারা গেল !’
আমার হাতের বইয়ের ব্যাগটা ধপাস করে মাটিতে পড়ে গেল। মুহূর্তে চোখের সামনে দৃশ্যমান জগতের সব আলো নিভে গেল।আমি টলতে টলতে আমার আজন্ম বাল্যবন্ধু হোসনাদের বাড়ীর দিকে পা বাড়ালাম।

বাড়ীর বাহির থেকেই হোসনার মায়ের আহাজারি শোনা যাচ্ছিল।
‘ ওরে আমার বুকের মানিক, তুই কোথায় চইল্যা গেলি রে! আমারে নিয়া গেলি না ক্যান্ গো !’
তাঁর এই ক্রন্দন ধ্বণি বাতাসের ঢেউয়ের সাথে চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ছিল। শোকাতুর প্রকৃতি নীরবে নতশিরে এই আঘাত সহ্য করে স্থির স্তব্ধ হয়ে আছে।

বরই গাছটি আগের মতই দাঁড়িয়ে আছে। তার ছায়ায় হোসনার নতুন কবর। সবকিছু ঘোরের মত লাগছে। নিজের সব আবেগ অনভূতি অসাড় মনে হচ্ছে। এই হোসনা ভূপতিত আমার দিকে বন্ধুর হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল। আমার হাতটি এখন কার দিকে বাড়াব ! বরই গাছটির নীচে দাঁড়িয়ে তার সবুজ পাতার ফাঁক দিয়ে নীল আকাশের অসীম নিষ্ঠুরতার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলাম।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

উত্তরাধিকার

উত্তরাধিকার

কাঁটায় কাঁটায় বিকেল চারটা পঞ্চান্নতে ডাইনিং রুমের উত্তরের দেয়ালে কাঠের ফ্রেমে বাঁধাই করা ফুলদানিতে বর্ণিল…..