হ্যাশট্যাগ আলো আসবেই

মাসকাওয়াথ আহসান
রম্য রচনা
Bengali
হ্যাশট্যাগ আলো আসবেই

আকাশ ছোয়া দালানে আগুন লেগে বিপন্ন মানুষ বাঁচার আশায় লাফ দিয়ে নীচে পড়তে থাকে। আগুন নেভানোর চেষ্টায় কতগুলো হেলিকপ্টার আকাশে ঘোরাঘুরি শুরু করে।

দালানের নিচে দাঁড়িয়ে হাজার হাজার মানুষ দেখতে থাকে ময়ূর প্রাসাদ পুড়ে যাবার ট্র্যাজেডি। তাদের অনেকে উদ্ধারকাজে অংশ নেয়, অনেকে অযথা ভিড় করে দাঁড়িয়ে থাকে। সহমত ভাই ফাউন্ডেশন-এর এক সদস্য খুব রেগে যায় দর্শকদের ওপর।

একজনকে সেলফি তুলতে দেখে তাকে ধমক দেয়, অসভ্য কোথাকার; কমনসেন্স নেই একদম।

গল্পের অডিওপাঠ শুনুন এখানে: 

অংশুমালী পডকাস্ট

রম্য রচনাঃ হ্যাশট্যাগ আলো আসবেইলেখকঃ মাসকাওয়াথ আহসানঅডিওপাঠ: তাসমিন সিদ্দিকীপ্রকাশক: অংশুমালীTitle: Hashtag Aalo AsbeiWritten by: Maskawath AhsanRecited by: Tasmin SiddikiPublished by: Ongshumali*অংশুমালী* অন্তর্জালে সংস্কৃতি ও সাহিত্যবিশ্ব*Ongshumali* A worldwide Bengali literary monthly'অন্তর্জালে সংস্কৃতি ও সাহিত্যবিশ্ব', বাংলাভাষায় একমাত্র বহুভাষিক বিশেষায়িত শিল্প-সংস্কৃতির আন্তর্জালিক ম্যাগাজিন 'অংশুমালী'। অংশুমালী পড়ুন, অংশুমালীতে লিখুন এবং প্রিয়জনকে অংশুমালীর কথা বলুন।অংশুমালীর ওয়েবসাইট লিংক: http://ongshumali.com/

Posted by অংশুমালী Ongshumali on Tuesday, April 2, 2019

সেলফি তোলা লোকটা জবাব দেয়, কবে এরকম পুড়ে মরে যাই; তার তো কোন ঠিক নাই; এমন মৃত্যুর প্রস্তুতি নিতেই এসেছি ভাই; এরপর আগুনে পুড়ে মরতে একদমই ভয় লাগবে না। দেখতে দেখতে অভ্যাস হয়ে যাচ্ছে।

সহমত ভাই ফাউন্ডেশন-এর সদস্য একথা শুনে বুঝতে পারে মানুষ নৈরাশ্যে পতিত হয়েছে। জনগণকে চাঙ্গা করতে ‘একটি কিশোর আগুন নেভানোর পানির মোটা পাইপের ছিদ্র প্রাণপনে চেপে ধরে রেখেছে’; এমন একটি ছবি ফেসবুকে পোস্ট করে লিখে দেয়, পানির পাইপের ছিদ্র নয়, দেখুন ছিদ্র দিয়ে পানি বের হওয়া আটকাতে এই কিশোরের আন্তরিক প্রচেষ্টাটুকু। ওর মুখমণ্ডলজুড়ে আছে দেশপ্রেম আর মানুষের জন্য ভালোবাসা। # আলো আসবেই।

এই # আলো আসবেই ট্রেন্ড ধরে রাখতে আরেক সহমত ভাই দমকল বাহিনীর সদস্যদের উদ্ধার কাজের ছবি দিয়ে আরেকটা পোস্ট দেয়, এই বীর ভাইদের দেখে রাখুন; মানুষ বাঁচাতে নিজের জীবন বাজি রেখেছেন তারা। এমন দেশপ্রেমিক বীরের হাত ধরে # আলো আসবেই।

জনগণকে আরো আশ্বস্ত করতে একজন মন্ত্রী বলেন, গত দেড়শো বছরে দেশের যে উন্নতি হয়নি; তার চেয়ে বেশি উন্নয়ন হয়েছে গত এক দশকে। এখন আমাদের হাতে এমন প্রযুক্তি রয়েছে; যা দিয়ে এক হাজার মাইল দূরে আগুন লাগলে তা মুহূর্তে জানিয়ে দেবে প্রযুক্তি। আলো আসবেই।

আরেকজন মন্ত্রী বিরোধি দল কিংবা নাগরিক সমাজের সদস্যদের মত আর্তনাদ করে ওঠেন, এই অগ্নিকাণ্ড স্পষ্টতই হত্যাকাণ্ড।

কে একজন মনে করিয়ে দেন, স্যার আপনি তো মন্ত্রী। আশা দিয়ে কিছু বলুন।

মন্ত্রী বলেন, মাত্র ১৫ দিনে মহানগরীর ঝুঁকিপূর্ণ দালান চিহ্নিত করবো। প্রতিটি দালানে অগ্নি নির্বাপন যন্ত্র রাখা নিশ্চিত করবো। আলো আসবেই।

মন্ত্রীর বক্তৃতার সময় তার পেছনে দুজন কর্মকর্তা ঘুমিয়ে পড়েন। ঘুমের মধ্যে তারা আলোক সাগরে সাঁতার কাটতে থাকেন।

এর পরপরই আগুনে পুড়ে যায় আরেকটি বাজার। সরকারি দলের
এক নেতা বলেন, এই পোড়া বাজারের জায়গায় অত্যাধুনিক শপিং মল গড়ে তোলা হবে। আলো আসবেই।

সহমত ভাই ফাউন্ডেশনের একজন সদস্য ফেসবুকে পোস্ট দেয়, অস্ট্রেলিয়ার তরুণেরা যেখানে রাজনীতিকের মাথায় ডিম ভেঙ্গে ডিমের অপচয় করে; সেখানে আমাদের তরুণেরা অগ্নিদগ্ধ বাজারের পোড়া ডিম খেয়ে পুষ্টিগুণ সংগ্রহ করে। আলো আসবেই।

মন্তব্যে আরেক সহমত ভাই মন্তব্য করে, উন্নয়নের আগে কেবল আলু-পোড়া খাওয়ার অভ্যাস ছিলো লোকজনের। উন্নয়নের পর পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ পোড়া ডিম খাচ্ছে সবাই। আলো আসবেই।

নগরের বিভিন্ন জায়গায় পুড়ে যাওয়া জিনিসপত্রের হাট বসে যায়। যেসব বিলাস সামগ্রী সামর্থ্যের বাইরে; তা একটু পুড়ে যাওয়ায় অত্যন্ত কম মূল্যে পাওয়া যাচ্ছে বলে হুমড়ি খেয়ে পড়ে ক্রেতারা।

একজন সহমত ভাই এর প্রশংসা করে, কবি বলেছেন, ‘জ্বলে পুড়ে ছারখার তবু মাথা নোয়াবার নয়’। মানুষের শোকের মাঝ থেকে শক্তি খুঁজে বের করার এই যে অদম্য ক্ষমতা; তা এটাই প্রমাণ করে আমরা অপরাজেয়। আলো আসবেই।

এবার নগরের মেয়র সংবাদ সম্মেলনে সবাইকে আশা দিতে বলেন, আমাদের শহরের ওপর আল্লাহর বিশেষ নজর আছে। আলো আসবেই।

একজন সাংবাদিক বলে, এই কারণে আগুণ লাগার পরপরই আমরা আমাদের নিউজ পোর্টালে আগুন নেভানোর দোয়া ছেপেছিলাম।

আরেকজন সাংবাদিক জানায়, আজকাল ভোটারেরা ভোট দিতে ভোটকেন্দ্রে আসে না বলে মসজিদের মাইকে তাদের ভোটদানের আহবান জানানো হয়।

সহমত ভাই ফাউন্ডেশানের এক সাংবাদিক বলে, আগুনের প্রসঙ্গে থাকুন; ভোটের প্রসঙ্গে যাচ্ছেন কেন!

আরেক সাংবাদিক মন্তব্য করে, মেয়র সাহেব বললেন, আমাদের শহরের দিকে আল্লাহর বিশেষ নজর আছে। তার মানে গত মেয়র নির্বাচনটির দিকেও আল্লাহর বিশেষ নজর ছিলো।

সহমত ভাই ফাউন্ডেশনের সাংবাদিক রেগে গিয়ে বলে, উন্নয়নের শত্রুতা করবেন না। আমাদের হন হন করে এগিয়ে যাবার পথের বাধা সরিয়ে নিন। আলো আসবেই।

মাসকাওয়াথ আহসান। লেখক, শিক্ষক ও সাংবাদিক। 'শিল্পের জন্য শিল্প নয়, সমাজ-রাজনৈতিক উত্তরণের জন্য শিল্প' এই ভাবনাটিই মাসকাওয়াথ আহসানের লেখালেখির প্রণোদনা। নাগরিক বিচ্ছিন্নতার বিচূর্ণীভাবনার গদ্য ‘বিষণ্ণতার শহর’-এর মাঝ দিয়েই লেখকের প্রকাশনার অভিষেক ঘটে। একটি পাঠক সমাজ তৈরি হয় যারা নাগরিক জীবনের...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ