দৃশ্যবিন্দুর অব্যক্ত ভাবনা

ভাস্বতী গোস্বামী
কবিতা, প্রবন্ধ
Bengali
দৃশ্যবিন্দুর অব্যক্ত ভাবনা

ঠেলতে ঠেলতে কোথায় যে যাই! সামনে সারি সারি সুড়ঙ্গ। সুড়ঙ্গে প্রবেশের মুখে এক আলো অন্যমুখে আলাদা। তো সেই আলাদা আলোচোখে দেখতে পাই মাঝের নিসর্গচিহ্নরা আড়ালেই থেকে গেছে। তাদের দেখার কোন উপায় আর নেই।

আমার শহরের স্কুলে একটিই চিলতে মাঠ ছিল। তাই নিয়েই দফায় দফায় আমরা দিন কাটাতাম। সকালে স্কুল বসার আগে স্কুলবাসে ফার্স্ট ট্রিপের ওয়ান-টুয়েরাও ভাগে পেত তাকে। কোমরে হাত দিয়ে চলত মালির ওপর চোটপাট।

…মালি, রোজ রোজ মাঠ ভিজিয়ে রাখো কেন? …আমাদের কিতকিত খেলার মাঠ খুঁজে
দাও এখন…

সে বেচারা মাঠের সম্বল একভাগ ঘাসজমির ওপর জলের পাইপ ছেড়ে কোন একটা রুমালটাক জায়গার দিকনির্দেশ করত, বড়দিদিদের কাবাডির ;মাঠ বাঁচিয়ে। খেলার সরঞ্জাম সামান্য। একটুকরো ইঁটকে ঘষে ঘষে গুটি বানানোর কেরামতি। তো ওই ক্ষুদে অবস্থাতেও কেমন করে যেন আহরণ-নির্মাণ-বিনির্মাণের খপ্পরে পড়ে গেলাম…

কাল ছিল ডাল খালি
আজ ফুলে যায় ভরে
বল দেখি তুই মালি
হয় সে কেমন করে
গাছের ভিতর থেকে
করে ওরা যাওয়া আসা

কোথা থাকে মুখ ঢেকে
কোথা যে ওদের বাসা

অপার বিস্ময়। এ কেমন প্রকাশ? দেখাটিই কোথায় যেন নিয়ে যায় শিশুমনকে। মামাবাড়ি গেলে খুব ভোরে উঠে ফুল তুলতাম দিদিমার সঙ্গে আর কান পাততাম ডালে ডালে। ফুলেদের আসা যাওয়ার শব্দ কেমন? আমার বইয়ের সেই ম্যাজিক ছবি আঁকছে চোখে…

আকাশে ডানা মেলিয়া গাছ কি জানিয়াছে
রঙ আসিতেছে তার শাখায় শাখায়…

এরকম কিছু একটা লিখে ফেলতে পারলেই যেন হাঁপ ছাড়তে পারি। চারপাশের দৃশ্যবিন্দু মনের মধ্যে কোন্ এক সুতোর আশপাশে দানা বাঁধবার আকুলিবিকুলি নেয়। কখনো পাঠলব্ধ কখনো অব্যক্ত ভাবনা একটা আকৃতি লাভের পিয়াসী হয়ে ওঠে। মূর্ত হওয়ার অপেক্ষায় স্বপ্নে-জাগরণে আপ্রাণ করে।

এখানেই কলম ধরা। দুনিয়াভর চলতে থাকে এই রঙের খেলা। তার শব্দ ভরে নিই পিচকিরিতে। চারদিকের ছড়িয়ে থাকা দেখা তিষ্ঠোতে দেয় না। আমার পিচকিরির সেই হলুদ-বেগুনি শব্দফোয়ারা যেন দেখাতে পারি তোমাকেও। তোমার শব্দের ঠুংরি শুনিও আমাকে। এই দেওয়া-নেওয়ার আকাঙ্ক্ষা থেকেই লেখার প্রেরণা।

স্কুল দিয়ে শুরু হয়েছিল গল্প। স্কুলের গল্পে একটা স্কুলব্যাগও লাগে। তো, যতো দিন যায় ততো ব্যাগ ভারি হয়। কথামালা-সাহিত্যমালা-শিশু-শিশু ভোলানাথের সঙ্গে সঙ্গে আমার নজর পড়ত ব্যাকরণ বইয়ের রচনা অংশে। সেইসব অংশে অজস্র রচনা চিঠি ইত্যাদি থাকত। কারা লেখে এসব? কেমন করে লেখা যায়? ঠিক করলাম আমিও লিখব।

দারুণ উত্তেজনা। প্রথম প্রথম বঙ্গলিপি খাতার শেষের পৃষ্ঠাগুলো পেন্সিল-ইরেজারের অত্যাচার সয়ে সয়ে ঘিয়েভাজা হয়ে গেল।

“আমাদের গ্রামের চারিপাশে খোলা মাঠ। সূর্যোদয়ের রঙে রঙিন হইয়া”, মুশকিল হতো তারপর এগোতে। আমাদের দক্ষিণ কলকাতার ঠিকানায় ভাড়াবাড়ির পশ্চিমে একটি পার্ক ছিল। সেখানে বিকেলবেলায় ছেলেরা বাস্কেটবল খেলত, কুস্তি শিখত। আর আমরা তারই মধ্যে দৌড়ে দৌড়ে ইঁট-পাতা-ঘাস-ফুল এমনকি ফ্রক থেকে ছিঁড়ে যাওয়া বোতাম নিয়েও যা পারি তাই খেলতাম। তো ওই, “ সূর্যাস্তের রঙে রঙিন হইয়া ছেলেরা কুস্তি শেখে” লিখতে পেন্সিলও নারাজ ছিল। আর লিখে ফেললেও আমার এ রচনা, বই দূরে থাক্ সামান্য স্কুল-ম্যাগাজিনেও যে ঠাঁই পাবে না এ বিশ্বাস অটল ছিল। মনে আছে ইংরেজি শব্দ ভাণ্ডার বাড়াতে ওয়ার্ড-ও- ফ্রেজের বই ছিল ক্লাসে। আমার ইচ্ছে-টিচ্ছের বালাই নেই কিন্তু স্কুলে ক্রিয়েটিভ রাইটংয়ের গুঁতো আছে। এক শীতের সকাল লিখতে হলে নির্জন পথ, তুষারাবৃত পাইন-ওক, মেঘাচ্ছন্ন দিন, রাসেট পাতার স্তূপ ইত্যাদি দিয়ে বর্ণনা করো। এমন এক ছোট পরীক্ষায় আমি লিখে এলাম, “সকাল উঠল। হরিণঘাটার দুধের ডিপোয় ঝাঁপ খুলল। সঙ্গে সঙ্গে শাল-আলোয়ান-মাংকি ক্যাপের তরঙ্গ খেলে গেল। ফুটপাতে মিষ্টির দোকানের সামনে নিভে আসা ছাইয়ে কুকুর আর ভিখিরি বুড়োকে ঘিরে কচুরি আর ছোলার ডালের গন্ধ ভাসছে।“ ফল, কুড়িতে এক এবং বাড়িতে তুলকালাম।

তবে আমার দেখা কোথায় বাজবে? কোথাও না বাজুক আমার মাথার মধ্যেই জাবর কাটল সে। বঙ্গলিপির দিন গিয়াছে। এবার পুরোনো ডায়েরি থেকে ফটোকপি পেজের উল্টো পিঠ। ছাপার অক্ষরে নাম দেখার যে ছেলেমানুষী শখ ছিল তা পৌঁছে দিল মনের অন্দরমহল ও বাইরের সংঘাতে। চারপাশের আবহের সঙ্গে অনেকটাই মেলাতে পারছি না ছাপার অক্ষরকে। শুরু হলো অন্বেষণ…

বকের পাখায় আলোক লুকায় ছাড়িয়া পূবের মাঠ
দূরে দূরে গ্রামে জ্বলে ওঠে দীপ আঁধারেতে থাকে হাট
(বিহারীলাল চক্রবর্তী)

কবি অদেখাকে স্বপ্নে গাঁথছেন। কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া ইশারা তো আমিও দেখতে পাই। কোন স্থবির রঙচিত্র নয়, কোন বাস্তব নিসর্গে দেখা ক্যানভাস নয় অথচ নীরবে একটি সন্ধ্যা প্রসারিত হলো চোখের অন্য দেখায়। এই খোঁজার তাগিদ থেকেই পাঠ এবং লেখার পিপাসা বেড়ে চলে। কৌতূহল, অন্বেষণ তো মানুষের সত্তায় জড়ানো। এই পৃথিবী জুড়ে প্রতিনিয়ত যে শব্দ-ছন্দ লিপিত হচ্ছে তা একটি ক্ষুদ্র আকারে নিজের মধ্যে ধ্বনিত হয় অহরহ। আহরণ-নির্মাণ-বিনির্মাণ। মনের রস তাতে ক্যাটালিস্ট হয়ে যায়।

এবার রন্ধন অসমাপ্ত করে পাকশালা ত্যাগ করা যায় না। তাকে পরিপূর্ণ ব্যঞ্জনে পক্ক করে পরিবেশিত করার পরই ছুটি।

সেতারের তারের মতোই কবির ও আমার মনের তার একসুরে কোথায় মিলে নিবিড় ঝংকার তোলে…

প্রতি অঙ্গ লাগি কাঁদে প্রতি অঙ্গ মোর
(জ্ঞানদাস)

চোখ, মন বদলে যাওয়ার মাহেন্দ্রক্ষণে সূর্যোদয় হলো চোখে। আহা কী দেখিলাম! অনুভবও শব্দের মধ্যে চিত্রিত হয়ে উঠছে। এক অন্যরকমের আকর্ষণ। কবিতাতে আরও বুঁদ হই। সুড়ঙ্গে প্রবেশ তো হয়ে গেছে এবার বেরোবার আলো খুঁজি…

পাখীক পাখ মীনক পানি
জীবক জীবন হাম ঐছে জানি
তুহু কৈছে মাধব কহ তুহুঁ মোয়
বিদ্যাপতি কহ দুহু দোহাঁ হোয়

পঞ্চদশ শতাব্দীতে বিদ্যাপতির পদ বিংশ শতাব্দীতে রবীন্দ্রনাথের কলমে পুনরায় প্রবাহিত হলো । পাঠ-অনুভবের জারন রস-মাধুর্য অন্য পূর্ণিমার আলো হয়ে এলো…

আজু সখি মুহু মুহু গাহে পিক কুহু কুহু
কুঞ্জবনে দুঁহু দুঁহু দোঁহার পানে চায়…

আলকে ফুল কাঁপয়ি কপোলে পড়ে ঝাঁপয়ি
মধু অনলে তাপয়ি খসয়ি পড়ু পায়ে

এবার বৃত্ত সম্পূর্ণ।

আবিষ্কারের আনন্দও কবিকে পাগল করে। জীবনানন্দের ধানসিঁড়ি ছুঁতে যাবো। লঞ্চে পার হচ্ছি বুড়িগঙ্গা। পাহাড়-ল্যাটেরাইটের দেশের মানুষ, অন্য নতুনে হারিয়ে ফেলছিলাম নিজেকে। রাত-নদী-আকাশ কী এক অসামান্য লয়ের সিম্ফোনিতে আচ্ছন্ন করে দিয়েছিল। অল্প অল্প কুয়াশার মধ্যে তারার আলোয়, জলের ফুলকিতে কবিতা এসে দাঁড়ালো ওই নীরব অন্ধকারে…

যে কোন নদীর ধারে
একাকী রাতের আঁধারে
দাঁড়িয়ে শুনেছে যে জলকান্না
সে তোমার দলে যাবে না
(মারজুক রাসেল)

কবিতার শব্দ-ঝর্ণা, জলের সন্তুরে বেজে ওঠে ঝালার তানে। পরে আমার মস্তিস্কে জারণ হয়…

অনেকেরই একটা নদী থাকে
বুকের বাঁ পাশে দাগের মতো
তার চিনচিনে জ্যোৎস্নায় কলম ডুবে যায়

অদ্ভুত ব্যাপার হলো, দিল্লির মে-মাসের গরমে টবে একটা ডালিয়া ফুটেছে । প্রকৃতি বদলাচ্ছে না লকডাউনের দূষণহীন প্রকৃতি? কোনটাই যুৎসই হচ্ছে না ঠিক। ফুল এসেছে কোন্ নিয়মে জানি না। তার প্রকাশের আলো-মাটি-জল কোনটাই আমার নয়। তবু ওই উপাদানে সিঞ্চিত হয়ে আমারই হলো সে। তার গায়ে লেগেছে আমার স্নেহ আমার শ্রমের আঁচড়। বীজ এলে তার জল মাটি আমারই। তার ফুটে ওঠাও। সে-ই আমার একান্ত লিপি। এই অজানার আনন্দ পাবো বলেই তো বারবার ডুবি ওই আলোয় ওই অন্ধকারে।

ভাস্বতী গোস্বামী দিল্লি প্রবাসী বাঙালি কবি। তিনি মঞ্চ সঞ্চালক এবং থিয়েটার অভিনেতা।ভাস্বতী অনুবাদের কাজও করেন। ২০১৫-এ তাঁর দ্বিভাষিক কাব্যগ্রন্থ ভাবনা কলেজ/ Moon in the block প্রকাশিত হয়।২০১৫ তেই তাঁর অনুদিত রশীদ কিডোয়াইয়ের বই ’24 Akbar Road (বাংলায় ২৪ আকবর রোড)...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

গণতন্ত্র, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও বাংলার নবজাগরণের দু একটি কথা

গণতন্ত্র, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও বাংলার নবজাগরণের দু একটি কথা

একটি পরাধীন দেশ আর তার বাসিন্দাদের মনে স্বাধীনতার আকুতি আমরা দেখেছিলাম ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতে। এর…..

কবি চন্ডীদাস ও চন্ডীভিটে

কবি চন্ডীদাস ও চন্ডীভিটে

  কেতুগ্রামে যেখানে চন্ডীদাস বাস করতেন সেইস্থানটি চন্ডীভিটে নামে লোকমুখে প্রচারিত। চোদ্দপুরুষের ভিটে বাঙালির মনে…..