এক বিশুদ্ধির আভিঘাত 

নিরুপম চক্রবর্তী
কবিতা, প্রবন্ধ
Bengali
এক বিশুদ্ধির আভিঘাত 

কেন পড়ি?

‘মাত্র একটি শব্দই ধরিয়ে দেয় রাতের রহস্য’ সেই কত কুড়ি কুড়ি বছর আগে এক বালক অকস্মাৎ খুঁজে পেয়েছিল এই পংক্তিটি, জেনেছিল এর লেখকের নাম আলেকজ়ান্ডার ব্লক: সেই তার ‘জল পড়ে পাতা নড়ে’, সেই তার ‘মা নিষাদ প্রতিষ্ঠাং ত্বমগমঃ শাশ্বতীঃ সমাঃ।’, কবিতার পথে অতঃপর তার সেই রহস্যের অন্বেষণ শুরু, সে অভিভূত, সে আপ্লুত, সে দ্যাখে তার খুঁজে পাওয়া কবিতার পাতায় উড্ডীয়মান সিন্ধুসারস, কোন এক অচেনা মহাসাগর ‘নাচিতেছে টারানটুলা রহস্যের’। কবিতার পাঠক হিসেবে তার সে অন্বেষণ আজও বা সমাপ্ত হল কই?

এই যে রহস্যময়তা যাকে আমি সফল কবিতার মূল উপাদান বলে চিনতে শিখেছিলাম সে কোন ফেলে আসা শৈশবে, পাঠক হিসেবে বুঝতে শিখেছি যে সেই অধরা মাধুরী যেমন ধরা যায় ছন্দবন্ধনে, গুণীর হাতে তেমনই সে ফুটে ওঠে মুক্ত গদ্যে। ইংরেজ শেক্সপিয়ারের সনেটে  বা ফরাসী ব্যোদলেয়ারের টানা গদ্যে, কবির ব্যক্তিগত ‘প্রেরগেটিভ’ অনুসারে, পাঠক হিসেবে আমি তাকে বারবার খুঁজে পাই। কবিতার কাজ রসসৃষ্টি করা, যার উৎস বিপুল, প্রণালী বিবিধ। কবিতা কাকে বলে তা নিয়ে আমি অনেক ভেবেছি বিভিন্ন গোত্রের কবিতাপাঠকালে। সুদীর্ঘ পাঠ্যাভ্যাস শেষে আজ আমি বুঝতে শিখেছি যে কবিতা বহুমাত্রিক: স্ফটিকের মতো তার একেকটি স্তর থেকে একেকটি বিচ্ছুরণ, এক একজন সফল  কবি তার কোনো একটিকে বেছে নেন ; এইমাত্র।

পাঠক হিসেবে কবিতাকে আমি বিশ্লেষণের অতীত বলে মনে করিনা। কবিতার নান্দনিক দিকটি অবশ্যই শিক্ষিত অনুভবের, কিন্ত একটি কবিতাকে ভালো বা মন্দ যে ভাবেই আমি গণ্য করিনা কেন, পরিশীলিত পাঠকের কাছে তার একটি যুক্তিগ্রাহ্য ব্যাখ্যা দেওয়ার দায়ভাগ থেকেই যায়। ‘কারণ শুধায়ো না, অর্থ নাহি তার, সুরের সঙ্কেত জাগে পুঞ্জিত বেদনার’, এরও অর্থ নিহিত আছে ওই সুরের সঙ্কেত আর পুঞ্জীভূত বেদনার নিবিড় এবং সঠিক অনুভবে, পাঠক হিসেবে আমি যদি তা অনুধাবন করতে না পারি, তবে ধরে নিতে বাধ্য হব যে আজও আমি কবিতা পাঠের যোগ্য হয়ে উঠিনি।

পাঠক হিসেবে কবিতার ব্যবচ্ছেদ করার স্বত্ব আমি সংরক্ষণ করি। প্রথাগতভাবে ভাবে যদি ছন্দ ব্যবহৃত হয়, আমি তার চলনের সৌন্দর্য শুধু শ্রবণে নয়, বৌদ্ধিক স্তরে বিশ্লেষণ করতে চাই। আমি মনে করি ছন্দ বিন্যাসের প্রাথমিক রীতিনীতিগুলি সম্পর্কে অনবহিত পাঠকের অশিক্ষিত পটুত্ত্ব কবিতার সর্বনাশ করে। আর আপাতদৃষ্টিতে গদ্যে নির্মিত কবিতাকে চিনতে এই পরিশীলনের প্রয়োজন হয় আরও অনেক বেশি। পুরুষালি পোশাকে সজ্জিত হলেও নারী যেমন পুরুষ হয়ে যাননা, এই নব কলেবরে কবিতা ঠিক তেমনভাবে কবিতাই থেকে যায়: তার বিষয়বস্তুর উপস্থাপনের স্বাতন্ত্র্য, তার চলনের স্বকীয়তা, তার শব্দ নির্বাচনের ‘লং রেঞ্জ অর্ডার’ তাকে শনাক্ত করে, গদ্যের থেকে আলাদা করে। সুদীর্ঘকালের অভ্যাসে পাঠক হিসেবে আমি তার স্পর্শ পাই; পুলকিত হই তাতে।

কবিতাপাঠের এই বিপুল আয়োজনের পরে থেকে যায় শুধু সর্বত্র আলোর মতো ছড়িয়ে পড়া আনন্দটুকু। শুধু কবি নন, আজন্ম কবিতালালিত মুগ্ধপাঠক, আমারও বলতে ইচ্ছা করে:

‘সূর্যাস্তের উল্কি ছিল গায় । ভোরহীন গ্রামহীন হে অরণ্য এই, হে মধ্যরাত, আমাদের এই এক কবিতার সময় । (লোকনাথ ভট্টাচার্য)’

কেন লিখি?

যেভাবে মাটির অন্ধকারে প্রোথিত বীজটি জানে তার অবয়বে অঙ্কুরিত উদ্ভিদটির অস্তিত্ত্বের কথা, সেভাবে একদিন, সে কোন সুদূর অতীতে আমিও নিঃসংশয়ে জেনেছিলাম যে আমি কবিতা লিখতে পারি। জীবনের প্রথম  কবিতাটি লিখেছিলাম আমার এক সহপাঠীর কাছে আত্মসম্মানরক্ষার্থে, কেননা সে আমার কবিতা রচনাশক্তি নিয়ে নিদারুণ সংশয় প্রকাশ করেছিল! তারপরে কবিতা লেখাটা রক্ত চলাচলের মতো স্বাভাবিক হয়ে ওঠে, কেননা আমার বেড়ে ওঠা প্রাকসত্তরদশকের হেয়ার স্কুলে, পরবর্তীতে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে, যেখানে  কবিতা লেখাটা  ছিল চলেফিরে বেড়াবার মতো একটা নেহাৎই সাধারণ স্কিল, যার জন্য নিজেকে স্বতন্ত্র মনে হয়নি কোনোদিন। কিন্তু এই দুই শিক্ষাঙ্গনে ওই সুদীর্ঘ বিচরণ আমাকে চিরায়তকালের জন্য প্রতিষ্ঠানবিরোধী করে তোলে, যার দায়ভাগ আজও আমি সানন্দে বহন করে বেড়াচ্ছি। আমার কাছে কবিতা রূপ নিতে থাকে এক বিশুদ্ধির আভিঘাত হিসেবে যেখানে মধ্যমেধার আস্ফালন বা প্রতিষ্ঠিত গুরুগৃহে সেবায়েতরূপে আত্মসমর্পণ সমভাবে ঘৃণ্য মনে হতে থাকে।

কালের  নিয়মে যাদপুর  বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বংসহা আচ্ছাদন একদিন সরে যায় মাথার ওপর থেকে। বাইরের বিশাল ক্রুকেড পৃথিবীতে আমি বুঝি; গোষ্ঠীবদ্ধতার বাইরে দাঁড়িয়ে, কবি-মোড়লদের স্নেহশীল হাত মস্তকে ধারণ না করে, আমার একটি রচনাও আমি পৌঁছে দিতে পারবোনা পাঠকের কাছে। সে  যুগ ছাপাখানার, আন্তর্জালের ঈশ্বরকূলের আবির্ভাব তখনও সুদূর ভবিষ্যতের গর্ভে।

আমি কবিতার বিশুদ্ধির কাছে বিশ্বস্ত থাকতে চাই। প্রিয় কবি লোরকার একটি আতিপ্রিয় স্বকৃত অনুবাদ ব্যতিরেকে, নির্মমভাবে নষ্ট করি আমার পূর্বজন্মের সমস্ত রচনা, নিঃশব্দে সরে আসি এক সুদূর আকাশে। তারপর অনেকবছর যেন ছদ্মবেশে বিচরণ: দিনভর যাদের সঙ্গে আমার ওঠাবসা তারা কবিতার ধার ধারেনা, বাংলাভাষায় আমার যে অক্ষর পরিচয় আছে সে তথ্যও তাদের অনেককে হতভম্ভ করবে। আমি নিজেও ও ভাষা ভোলবার কসরৎ করি  আপ্রাণ: কিন্তু সিয়াটল শহরে ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের আবিশ্বাস্য সম্ভ্রান্ত গ্রন্থাগারটিতে দ্বিসহস্রাধিক বাংলা বইয়ের সম্ভার! ফল্গুধারার মতো গোপনে তা আমার রক্তস্রোতকে নিরবচ্ছিন্ন ভাবে সিঞ্চিত করে যায়।

তারপরে স্বদেশে গো-বলয়ে প্রত্যাবর্তন, সেখানে অনেক বছর, তারপর পরিবর্তিত বঙ্গে। বেশ কয়েক দশক কাটে, কবিতার একটি শব্দও উচ্চারিত হয়না; শুধু জমে উঠতে থাকে যন্ত্রণাসমূহ। তারপর একদিন জ্বালামুখীর লাভাস্তরের মত, অপ্রকৃতস্থ বিস্ফোরণের মত একটি কবিতার জন্ম হয় নিয়ন্ত্রণবিহীন। এরপর এক অগ্রজাপ্রতিম নারী, তাঁর সাহিত্যবোধ প্রশ্নাতীত, আমাকে প্রায় ঘাড় ধরে টেনে আনেন এক তন্নিষ্ঠ সম্পাদকের কাছে। তাঁদের যৌথ তাড়নায় লিখতে থাকি, আর সবিস্ময়ে আবিষ্কার করি আমার এই নিভৃত উচ্চারণগুলি কাউকে কাউকে ছুঁয়ে যাচ্ছে। তারপরে এক তরুণ প্রবল উৎসাহে প্রকাশ করে আমার কবিতার বই ‘নিজস্ব বাতাস বয়ে যায়!’ এবং পরবর্তীকালে ‘বেস্কিড পাহাড়ের ভার্জিন মেরি!’, যার অলঙ্করণের দায়িত্ব নেয় অন্য এক প্রতিভাবান তরুণ। এরা আমাকে কৃতজ্ঞ করে রাখে, আমি সংলগ্ন থাকি এই দুটি কেতাবের বিস্ময়চিহ্ন দুটির সঙ্গে, কেননা কবিতা আমার কাছে প্রবল বিস্ময়ের দ্যোতনা মাত্র, নামপত্রের বাকিটা তাই আমার কাছে নেহাতই গৌণ।

অর্থাৎ ব্যাপারটা এই: এককালে লিখতাম, বহুকাল লিখিনি, একালে লিখি। আর কেন লিখি এ প্রশ্নটা বহুবার নিজেকে করেছি, উত্তরটা সম্ভবত আমার জানা। দীর্ঘ বিরহের পরে প্রথম কবিতাটির প্রবল উদ্বেলিত উদ্ভব, যে উপাখ্যান আমি ইতিপূর্বে বর্ণনা করেছি, তা একটি ব্যতিক্রম মাত্র, গাণিতিক পরিভাষায় সিঙ্গুলারিটি। আবেগের উৎসমুখে কবিতার জন্ম অবশ্যই আমি স্বীকার করি, কিন্তু তার গুণমান বিচার আর পরিশীলনের দায়ভাগ বর্তায় অজস্র গ্রীষ্ম বসন্ত জুড়ে গড়ে ওঠা আমার কাব্যবোধের ওপরে। আমার নিজের কবিতার পরম রূঢ় নির্মম সমালোচক আমি নিজেই। যে কবিতার উন্মেষে আমি তার কাছে আমার প্রত্যাশার পরিপূর্ণতা খুঁজে পাইনা, নৃশংস আমি তৎক্ষণাৎ তার মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করি, সেসব উন্মেষ সাধারণ্যের গোচরে আসবার ঢের আগে বিলুপ্ত হয়ে যায়।

যেসব অসীম প্রতিভাবান সায়াহ্নে ও প্রাতে নিরন্তর কবিতার জন্ম দিয়ে যান, যাদের কাব্যগুচ্ছের ভর ইতিমধ্যেই গদ্য-পদ্য-প্রবন্ধের সমাহার সমগ্র রবীন্দ্র রচনাবলীকে অতিক্রম করে গেছে, তাঁদের দিকে আমি সভয়ে দৃষ্টিপাত করি। কেননা কোন কোন কবিতা লিখতে আমার অতিদীর্ঘ সময় লেগে যায়। বাস্তবজীবনের দৃশ্য ও অনুভব তাদের সৌন্দর্য, কুশ্রীতা, আনন্দ, দুখ, হর্ষ ও বিষাদের সারি তাদের কনভ্যুলেটেড, রূপান্তরিত অবয়বে বিম্বিত হয় আমার কবিতার নিজস্ব অসমতলে, তৈরি হয় এক মেটা-বাস্তবতা, সে আমার কবিতার নিজস্ব জগত: সেখানে প্রতিটি কবিতাকে আমার নির্মাণ করতে হয় ভাস্করের শ্রমে ও সতর্কতায়; বিচক্ষণ পাঠকের চোখে সেই স্বেদচিহ্ন ধরা পড়ে কিনা সম্যক জানিনা।

ভাষাকে আমি ভাবের বাহন বলে  মানি আর আমার কবিতাকে বহন করে আনে ছন্দ। ভাবের তারতম্যে ভাষাকে স্বেচ্ছায় রূপান্তরিত করতে শিখেছি বহুদিন। সুনীলবাবু প্রমুখের নীরক্ত বাংলা আমার বিবমিষা জাগ্রত করে। তথাকথিত চলিত বাংলায় লিখতে পারি অবশ্যই, এবং লিখিও। কিন্তু আমার প্রাণ পড়ে থাকে প্রমিত বাংলার তুর্যনিনাদে, আমি তার সংকরায়ণ করি বিদেশি শব্দের প্রয়োগে, ক্ষেত্র বিশেষে চলিত ক্রিয়াপদের মিশ্রণে। এই সংকরায়ণের প্রক্রিয়াটা জটিল, স্বাদু ব্যঞ্জনে মশলার সঠিক প্রয়োগের মতো, যেখানে সামান্য অনুপানের তারতম্যে বিপর্যয়ের সম্ভাবনা অতি প্রবল। আর ছন্দকে যারা বন্ধন বলে মনে করেন করুণা হয় এই ভেবে যে তাঁরা কোনদিন জানবেন না যে ছন্দের স্বাভাবিক প্রয়োগ কবিতার ব্যাপ্তি ও পরিধি ঠিক কতটা প্রসারিত করে। যেন এক পদাতিক পৌঁছে যায় বিমানের ককপিটে, যেন এই নীলগ্রহের পরিপূর্ণ বিস্তারে ডানা মেলবার ক্ষমতা পৌঁছে যায় হাতে। ছন্দে লেখার জন্য আমাকে গুণেগুণে মাত্রা বসাতে হয়না; গদ্যে লেখার মতো আনায়াসে আমি হেঁটে চলি ‘ছন্দের বারান্দায়’, প্রয়োজনবোধে তার রূপান্তর সাধন করি। মানুষের দু’পায়ে চলার মধ্যেও তো নিহিত আছে জটিল বলবিদ্যা, প্রতিটি পদক্ষেপের আগে আমরাতো তা স্মরণ করিনা, ছন্দের সঙ্গে আমার আভিঘাতও সেই একই স্তরের!

এভাবেই লিখি, এইজন্যই। লিখতে লিখতে ভাবতে চেষ্টা করি পাঠকের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়ার কথা। আমার নিজের কাছে কিছু প্রমাণ করার নেই, কিন্তু পাঠকের কথা আমি ভাবি। আমার কবিতার অজস্র পাঠক নেই, তার প্রয়োজনও আমি দেখিনা; কিন্তু আমি জানি কোনকোন অন্তঃকরণে আমার এই নির্মাণগুলি লহরিত হয়।

যতদিন ওরকম একজনেরও অস্তিত্ব থাকবে, আমার লেখার আমি একটা উদ্দেশ্য খুঁজে পাবো। তাই লিখি। এবং লিখবো।

নিরুপম চক্রবর্তী। কবি। জন্ম ও বাস ভারতের পশ্চিমবঙ্গরাজ্যের কলকাতা। জনশ্রুতি এইরকম যে তিনি স্বদেশে ও বিদেশে কিছু অপ্রয়োজনীয় প্রযুক্তিবিদ্যার অধ্যাপক ও সাম্মানিক অধ্যাপক পদে আসীন। প্রথাগত অশিক্ষার শুরু ভারতবর্ষে ও সমাপ্তি আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে। বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় বর্ণপরিচয় ও ফার্স্টবুক...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

ফেরা

ফেরা

ফেরা অনেক দিন আসিনি তোমার চোখের কোণে, বুকের পাশে, নিঃশ্বাসের চারপাশে। ভেবো না আমি পথ…..