নাজনীন খলিল
কবিতা
Bengali

রঙ

কারো গাঢ় নীল চোখ
বেজে যাচ্ছে বেদনার্ত সেতারের মতো;
যেন ডানা মেলে উড়ে যাচ্ছে এক খন্ড আকাশ,
যেন এক্ষুণি জন্ম নেবে এক নতুন সমুদ্র।
অথবা মনে করো
এক বিভোর উদ্যানে অপরাজিতা ফুটেছে অনেক
যেন নীল নীল ভোরের আধখোলা জানালায়
সবুজ ঝালরের ফাঁকে উঁকিঝুঁকি দেয়া সকালের দূত।
আকাশ অথবা সমুদ্রের এই প্রগাঢ় রঙ
আনন্দ নাকি যন্ত্রণার এই প্রশ্ন ভুলে
এক মনোরম ল্যান্ডস্কেপে বিমুগ্ধ,
তাকিয়েই থাকি।
মাঝেমাঝে
দুঃখ ও সুখের সব রঙ বুঝি এমনি একাত্ম!

এখনো দুই হাতে বিবর্ণ ধূসরতা মাখা,
ছায়াটাকে আততায়ী ভেবে নিয়েছি সন্ন্যাস ;
রঙিন ফানুশ ওড়ানো কালে
এই চিত্রকল্প খুব বেমানান মনে হয়।

চোখের ব্যাথা দেখি,
অথবা নীলকণ্ঠ ফুলের সুন্দর
কথাতো একটাই
আমার বিবর্ণ ধুসর হাত নীল ছুঁয়ে থাকে।
মনে হয়
এইসব রঙের বিপরীতে ভিন্ন কোন রঙ নেই,
ছিলোনা কোথাও।

 

সসেমিরা সময়

গোপন কোঠরে চুপচাপ বসে থাকি ;
আমার চারপাশে গল্প তৈরি হয়
গাছের, ছায়ার, ঝরাপাতা আর শামুকের।

অঙ্গন
তার ছায়ার ভেতরে টেনে নিয়েছে,
একটি গাছ
ডালপালাসহ পাখির ছোট্ট ঘর।
পাতার উপরে পাতা ঝরে গেলে
আধো আধো নূপুরধ্বনি বাজে;
যেন
তবলার বোলের অপেক্ষায় তৈরি নাচের মেয়েরা
আনমনা টুকছে
অস্থিরআলতো পায়ের ঘুঙুর।
বৃক্ষের এই ছায়ামগ্ন বিলাসের মাঝখানে
আমারো কী কোথাও একটুখানি প্রাপ্যছায়া
পড়ে আছে?

গল্পপাঠে – সাদা পৃষ্ঠায় নিবদ্ধ উৎসুক চোখ;
পাপড়ির নীচে জমা
হাজারবছরের প্যাপিরাসকথা,
এক অতল অন্ধকার
টানেলবিভ্রান্ত পথিকের গল্পটিও।

ক্যামেরায় ত্রস্ত শাটার টিপে
প্যানোরামার ভেতরের রহস্যরক্তিম এক ছবি
তুলতে গেলে
সমস্ত চিত্রপট উধাও, ঘোরলাল মেঘের আড়ালে।
দৃশ্য কি নিজেই নিজেকে লুকোয় আগুনের আঁচে?

জলভারে নত হয়ে আছে সসেমিরা ঘড়ির সময়।

 

ইশ্বর

আকণ্ঠসূরার ভারে টলতে টলতে কোথায় যাচ্ছে এ মাতাল শহর!

আমাদের ঘরে কোন ঈশ্বর আসেননা।
মেঘ ছিঁড়ে ঝুম বৃষ্টি নামলেই,
আধোঅন্ধকার ঘরে
থোবড়ানো বিয়ারের ক্যান হাতে কেবলই ঝিমান।
আমরা দিনরাত্রি তার তপস্যায় থাকি
প্রার্থনারত হাতগুলো থেকে মাঝেমধ্যে ‘আহা ‘ ধ্বনি বাজে।

মাত্র আধহাত দূরে পানপাত্র রেখে
যে লোকটা অসীমধৈর্যে বসে আছে
ঠোঁটে ছোঁয়ালেই শেষ হয়ে যাবে ভয়ে ;
সেই সুস্থির লোকটাকেই ঈশ্বর মনে হয়।

এই যে এখন, টালমাটাল পায়ে হেঁটে যাচ্ছে একজন ঘোরমাতাল
যদি ঠিকঠাক দরোজায় ঠোকা দেয় সেও তো ঈশ্বর হয়ে যেতে পারে….

ঝরো, অন্যসময়ে

না থাকাই ভালো ছিল এতোটা আগুন
মলাটের গোপনে
পাতা জুড়ে থাকে বিশাল প্রান্তরমাঠ,
আগুন?
আগেই বলেছি।
বুকের ভেতরে কেউটের বাস
তবু
তোমাদের বাগানে ফোটে বসরাই গোলাপ, ব্ল্যাকপ্রিন্স।
আর এখানে
এক বুক আগুন নিয়ে ক্লিষ্ট বসে থাকি
জ্বলতে পারিনা ;
গাছের বাকলে শুধু লিখে রাখি,
‘দহন, দহন’।
আজ আর এখানে এসোনা
মেঘমল্লারে মন নেই
দেখো ডানার ছায়া কেমন মুছলো আকাশ।
এখন জারুল ঝরার বেলা;
ঝরো তুমি
অন্য সময়।

নাজনীন খলিল। জন্ম ৬ নভেম্বর, ১৯৫৭ সাল; সিলেট। পড়াশুনা এবং কর্মক্ষেত্র সিলেট। সত্তর দশকের মাঝামাঝি থেকে লেখালেখির শুরু। বিভিন্ন পত্রিকা সম্পাদনার পাশাপাশি দীর্ঘদিন রেডিও বাংলাদেশ সিলেটের একজন নিয়মিত কথক, গ্রন্থক এবং উপস্থাপকের দায়িত্বপালন করেছেন। লেখালেখির বিষয়বস্তু মূলত কবিতা, প্রবন্ধ এবং...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ