কোনো এক সূদুরতমাকে ও অন্যান্য

শেখর বালা
কবিতা
Bengali
কোনো এক সূদুরতমাকে ও অন্যান্য

বন্ধক

ইন্টারনেট অ্যাড্রয়েডের যুগে
মানুষের বন্ধুত্বের নেটওয়ার্ক যখন
ক্ষুদ্র থেকে বৃহত্তের দিকে ধাবিত হচ্ছে
ক্রমশঃ জ্যামিতিক হারে –
তখন আমার জীবনে কেন
ঘটে যাচ্ছে বিপরীত ঘটনা?
নাহ্ এখন আমার আর কোন
বন্ধু কিংবা স্বজন নেই
জন্মের সূচনা হতে বন্ধুত্বের যে চারাগাছ
করেছিলাম হৃদয়ে রোপন
তবে তাতে কী সময় মত দেইনি জল,
করেছি যত্নে হেলা?
তাহলে কেন, কেন তা সমস্ত ভুপৃষ্ঠে
শিকড় গজিয়ে মহীরুহে পরিনত হলো না!

এখন আমার ছোট্ট ভুবনে
এই পাথর মানুষ আমি সম্পুর্ন একা
সারাদিন ফোন হাতে বসে থাকি
কিন্তু ক্রিং ক্রিং মধুছন্দে কোন ফোন
কিংবা এক লাইনের ক্ষুদেবার্তা ও
ভেসে উঠে না –
মুখ কালো করে থাকা স্ক্রিনে।
আর আমি ও পাই না খুঁজে এমন স্বজ্জন যাকে ফোন দিয়ে উগলে দিতে পারি
জমিয়ে রাখা কথার ঝাপি।

কোটি কোটি বছর আগে থেকে নিয়ম করে
কেবল যে তুমি খোঁজ নিতে প্রতিটি মুহূর্ত আর উৎসব পার্বনে-
শুনেছি সেই তুমি উচ্চ সুদ হারে
রেখেছো হৃদয় বন্ধক বিশ্বব্যাংকে!

 

তোমার দেখা পাবার আশায়..

তুমি কাছে না আসলেও
তোমাকে দেখা কিন্তু আমার থেমে থাকে না
চার প্রহরের বিল, জঙ্গল, কাঁদাপথ আর পাহাড় পর্বত পেরিয়ে আমি ঠিক ই চলে যাই তোমার দুয়ারে।
বলতে পারো একতরফা ভালবাসার মতন
এখন আমার এই একতরফা দেখা করা।

ভাবছো তো ভুলেই গেছি,
“যাক বাবা কেটে গেছে বিপদের ফ্যাড়া
মাগো! কী ভয়ংকর সেই ত্যাড়া মাথা…”
এই কথা ভেবে তোমার নিশ্চয়ই খুশি খুশি লাগে নিজেকে!!
অথচ এই আমি প্রায়শঃ বিহানবেলা
তোমাকে ফাঁকি দিয়ে মাছরাঙার তীক্ষ্ণ চোখে
দূর থেকে দেখি তোমার গতিময় জীবন।
খাঁ খাঁ রোদ্দুরে গনগনে সূর্যকে
পাঁচ আঙুলে ঢেঁকে কী দূর্দমেই না তুমি
ছুটে যাচ্ছো নির্দিষ্ট গন্তব্যে।

তখন খুব ইচ্ছে হয়-
ছাতা মেলে তোমার পাশে হাঁটি
হাঁটতে হাঁটতে দু এক কথা বলি।
হাঁটতে হাঁটতে অভিমানের খেয়া
দুঃখ কষ্ট ভাগ করে যায় নেওয়া।
হাঁটতে হাঁটতে সবুজ রমনা ঘুরি
দূর্বা ঘাসে কবিতা পাঠ করি।
হাঁটতে হাঁটতে কত্ত কথার ডোজ
টিএসসিতে ইফতার পাটির ভোজ।
হাঁটতে হাঁটতে শাহবাগ, বইমেলা
মনের ভিতর স্বপ্নবাজের খেলা।
হাঁটতে হাঁটতে পয়লা বৈশাখ আসে
কত কথা হয় চারুকলার ছাদে।
হাঁটতে হাঁটতে কত পথই চলি
কেয়ারি প্লাজার ১৫ নাম্বার গলি।
হাঁটতে হাঁটতে পুরনো সেই তুমি
হাঁটতে হাঁটতেই সাড়ে তিন হাত ভূমি!

 

ছবিবন্যা

একসময় ছবি তোলার খুব ঝোঁক ছিল আমার
এখন ও যে নেই তাও সত্য নয়
কিন্তু তখনকার সেই ইচ্ছা সেই উদ্যম
স্বীকার করতে দ্বিধা নেই
তা আজ অনেকটাই ফিকে হয়ে গেছে।
পিঠে চে’র ছবিওয়ালা ব্যাগ, গলায় ঝুলানো ক্যামেরা, জিন্সের প্যান্ট টি শার্ট পায়ে কেডস এবং নিত্যসংগী সাইকেল নিয়ে ছবি তুলতে বের হওয়ার একটা দৃশ্য ও
কল্পনায় দেখতে পেতাম।
তোমাকে ও সংগী করে নিয়ে যাচ্ছি
টিএসসি, রমনাপার্ক,  সোহরাওর্য়াদীর শিখা চিরন্তনে
তুমি পোজ দিচ্ছ আর আমি ক্লিকের পরে ক্লিক দিয়ে যাচ্ছি।

মনে পড়ে চারুকলার প্রর্দশনী দেখতে দেখতে একদিন বলেছিলাম-
এই ছবিটার পাশে দাঁড়াও তো একটা ছবি তুলি
তুমি বললে না থাক
ছবি তুলতে একদম পছন্দ করি না আমি
কিন্তু ঐ যে ওরা তো তুলছে
তুমি তখন কড়া সুরে দার্শনিকের মত বুলি আওড়ালে
“ঘুরতে এসে যারা ছবি তুলে ব্যস্ত সময় কাটায়
সুন্দর দৃশ্য দেখাটাই তাদের মাটি হয়ে যায়।”

এখন মুখপঞ্জিতে দেখতে পাই তোমার শত শত ছবি
কখন ও নীলাম্বরী শাড়িতে আকাশ দেখি
কখনোবা মন সতেজ করা একটুখানি সবুজ
আবার কখন ও সাদা লাল পাড় শাড়িতে বিদ্যা স্বরস্বতী।
আর ফাল্গুনের বাসন্তী রংয়ের শাড়িতে আমি শুনি কোকিলের গান
নীল পরি লাল পরি সব শাড়িতেই মন খারাপ করা
অসাধারন সুন্দর লাগে তোমাকে।
তখন কানে বাজে পুরনো দিনের সেই কথাগুলো
এখন কী তবে দৃশ্য দেখার চাইতে…….
থাক কী লাভ অযথা কথা বাড়িয়ে
বরং প্রতি বছর তোমার ছবিবন্যা হোক এই প্রার্থনাই বেশি শ্রেয়।

আমি ফটোগ্রাফার হতে পারি নি-
হতে পারি নি আরো অনেক কিছু
তাতে কি-
তুমি তো ছবির কবি হয়েছো।।

 

মনবাড়ি

আজ মন ভাল নেই
মনবাড়ি খুব অগোছালো
হাঁটছি ভাবছি আঁকছি মনে
তোমার কোমল মুখের আদল।

আগে যখন এমন হত
চলে যেতাম তোমার খোঁজে
বলতাম আমি লেকের মুখে
চলে এসো জলদি করে।

রেগে তুমি আগুন হতে
বলতে আমায় না জানিয়ে..
তোমার মত পাগল ছেলে
এই দুনিয়ায় কয়টা আছে?

বাইরে তুমি রাগ দেখাতে
অন্তরটাতো আমি চিনি
ভালোবাসার ফল্লুধারায়
আমি কেবল ভিজতে থাকি।

 

কোনো এক সূদুরতমাকে

আমি তোমার চোখ বরাবর ছিলাম
তবু আমায় দেখতে পারো নি তো
দেখবে কেমনে, কেমনে দেখবে তুমি
হৃদজমিনে আছি না…কি আমি!

আমি এখন অনেক দূরের তারা
যন্ত্র ছাড়া যায় না কভু দেখা
একটি যন্ত্র ছিল তোমার কাছে
জানি; বিকল হয়ে পড়ে আছে ঘরে।

যদিও তোমার রিকশা চলে জোরে
ভুল করে ও যায় না চেন পড়ে
এত ডাকি তোমার গড রে মনে
যেনো লক্কর ঝক্কর রিকশাখানি জোটে।

কিংবা তোমার বাসার গেটের মুখে
কোনো রিকশা যায় নি ভুল করে
রোদে হেঁটেই যাচ্ছো অফিসমুখে
(তখন) মাথার উপর ধরবো ছাতা গিয়ে।

অবাক হবে ভীষণ অবাক হবে
ভয় ও পাবে ভুতের কান্ড ভেবে
কাঁপতে থাকা ওই কোমল মুখশ্রী
প্রানভরেই তো দেখতে চাই আমি।

শেখর বালা। কবি। জন্ম, ১৫ জানুয়ারি ১৯৮৫, টুঙ্গিপাড়া, গোপালগঞ্জ; বাংলাদেশ।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

কবুতর

কবুতর

অগ্নিকাণ্ড আমার চৌহদ্দিতে ধ্বংসস্তুপের ভীড় পুনর্বার নুয়ে পড়া অতীতের তীর জীবনের মাঝপথে রেখে যায় সম্পর্কের…..